putin
LiFe HistOrY

বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর রুট সম্রাট: পুতিন

 

putinThe world’s number one power route emperor: Putin

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জীবন-যাপন জানতে চান না এমন মানুষ পাওয়া ভার। তাই তাকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লেখা-লেখির কমতিও নেই।

অনেকের মতেই বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর ক্ষমতাধর ব্যক্তি ভ্লাদিমির পুতিন।

বর্তমান বিশ্বে হাতেগোনা যে কয়েকজন নেতা সম্পূর্ণ নিজের মত করে চলার ও দেশকে নিজের মত করে পরিচালিত করার সাহস রাখেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁদের অন্যতম। সারা বিশ্ব যখন আমেরিকা ও তার মিত্রদের ভয়ে কাপছিল, পুতিন তখন তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তাঁর নিজের বিচার বিবেচনায় তাঁর দেশের ভেতরের ও বাইরের সমস্যাগুলোর সমাধান করেন। তাঁর দৃঢ়চেতা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে তিনি রাশিয়ার রাজনীতিবিদ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসততাকে দমনে রেখেছেন।

পশ্চিমারা তাঁর বিরুদ্ধে দানা বাঁধা সমস্ত প্রতিরোধকে তিনি কঠোর হাতে দমন করে চলেছেন এখনও। তিনি দুই মেয়াদে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এবং দুই মেয়াদে দেশটির রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এখনও নিষ্ঠার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এবং রাশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

তাঁর দেশের বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে ভালবাসে, সমর্থন করে এবং তাদের শাসক হিসেবে দেখতে চায়। বলা হয়, পুতিন সাহায্য না করলে ট্রাম্প কখনওই যুক্তরাষ্ট্রের পেসিডেন্ট হতে পারতেন না। নিন্দুকেরা নিন্দা করলেও, এটা পুতিনের ক্ষমতারই পরিচায়ক।

পুতিন ১৯৫২ সালের ৭ই অক্টোবর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লেলিনগ্রাদে খুবই সাধারন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

 সমস্ত গুন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট নিয়ে জন্মালেও শৈশবে পুতিন ছিলেন মারাত্মক দুষ্টু ও পড়াশুনায় অমনযোগী।

putin

পুতিনের মা মারিয়া অসম্ভর রকমের দয়ালু এবং নরম মনের একজন মানুষ ছিলেন। পুতিনের ভাষ্য – “আমরা খুবই সাধারন ভাবে থাকতাম। আমি খুবই মানবতার জীবন যাপন করতাম।”

১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পুতিন  স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুল এর ছাত্র ছিলেন। অষ্টম শ্রেণী পাশ করার পর তিনি প্রাইমারী ছেড়ে হাইস্কুলে ভর্তি হন। হাইস্কুলটি ছিল রসায়ন বিদ্যায় বিশেষ প্রাধান্য দেয়া একটি প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৭০ সালে পুতিন এখান থেকে পাশ করে বের হন।

তবে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত পুতিন ভাল ছাত্রের থেকে “দুষ্টু ছেলে” হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁর কথা অনুযায়ী – “আমি প্রথম ক্লাসে বরাবরই দেরিতে পৌঁছাতাম। এমনকি শীতের দিনেও আমি ঠিকঠাক ভাবে স্কুলড্রেসে আসতে পারতাম না।”

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ে পুতিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাঁকে জীবনে বড় কিছু অর্জন করতে হবে, এরপর থেকেই তিনি ভাল ফলাফল করতে শুরু করলেন। তিনি “ইয়ং পাইওনিয়ার্স অর্গানাইজেশানে” যোগ দেয়ার সুযোগও করে নিলেন – স্কাউটের মত একটি সংগঠন। এই সংগঠনে যোগ দেয়ার প্রায় সাথে সাথেই তিনি তাঁর সমবয়সী পাইওনিয়ারদের নেতা হয়ে যান।

সেই সময়ে মনোভাবের বিষয়ে পুতিন বলেন – “আমার কাছে এই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ ভাল ছাত্র হওয়াটাই যথেষ্ঠ নয়, কাজেই আমি খেলাধুলায় অংশ নিতে শুরু করলাম। কিন্তু সেটাও আমার মর্যাদাকে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ঠ মনে হলো না।

১৯৭০ সালে পুতিন লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর শ্রেণীতে ১০০ জন শিক্ষার্থী ছিল এবং পুতিন সহ মাত্র দশজন ছিল হাইস্কুল পাশ করা ছাত্র। বাকি সবাই মিলিটারি সার্ভিস শেষ করে এসেছিল। এই ১০টি আসনের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিল ৪০০ জন শিক্ষার্থী। পুতিন রচনায় পাঁচের মধ্যে চার পাওয়া ছাড়া বাকি সবগুলো বিষয়ে সর্বোচ্চ মার্ক পেয়ে পাশ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করার পরে নিজের মনোভাব বলতে গিয়ে পুতিন বলেন – “আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করলাম আমার সামনে নতুন উদ্দেশ্য এবং আমার মাঝে নতুন ভাবনার জন্ম হলো। আমি পড়াশুনাকে আরও বেশি গূরুত্ব দিতে শুরু করলাম এবং খেলাধুলার বিষয়টা দ্বিতীয় পছন্দের বিষয়ে পরিনত হলো। আমি নিয়মিতই আমার প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। 

দেশের সেবা করার স্বপ্ন পূরণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পরপরই পুতিন যোগ দেন রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায়। পরিচালকের সহকারী হিসেবে ইন্টেলিজেন্সে তাঁর কাজের শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এ বদলী হন। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স শাখায় তিনি পাঁচ মাসের মত কাজ করেন। ইন্টেলিজেন্সে কাজ করার প্রায় ছয় মাসের মাথায় তাঁকে বেশ কয়েকটি অপারেশন এবং প্রশিক্ষণ কোর্স করতে পাঠানো হয়। তারপর তিনি আবার কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সে ফিরে আসেন এবং আরও ছয় মাস সেই বিভাগে কাজ করেন।

কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এ দ্বিতীয় মেয়াদে কাজ করার সময়ে তিনি ফরেন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁকে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য মস্কোতে পাঠানো হয়। সেখানে এক বছর কাটানোর পর তিনি লেলিনগ্রাদে ফিরে যান, সেখানকার প্রধান কেজিবি শাখায় তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর কাজ করেন।

putin

তিনি আশির দশকের শুরুর দিকে লুডমিলা নামের এক তরুণীর প্রেমে পড়েছিলেন।তাঁর প্রেমের কথা স্মরণ করতে গিয়ে লুডমিলা বলেন “পুতিনের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যা আমাকে আকর্ষণ করেছিল। তিন-চার মাসের মধ্যেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম এই লোকটিকে আমার প্রয়োজন।”

১৯৮৩ সালের ২৮ জুলাই পুতিন ও লুডমিলা বিয়ে করেন। ২০১৩ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে তাঁদের ত্রিশ বছরের দাম্পত্যের ইতি ঘটে।

বিয়ের দুই বছর পর ১৯৮৫ সালে পুতিন ও লুডমিলার বড় মেয়ে মারিয়ার জন্ম হয়। পরের বছরই তাঁদের দ্বিতীয় মেয়ে ক্যাটরিনা জন্মগ্রহণ করে। ক্যাটরিনার জন্ম হয় জার্মানির ডিসডেনে।

পুতিনের দুই কন্যার নামই তাদের তাদের দাদী ও নানীর সম্মানে রাখা। মারিয়া (পুতিনের মা) ইক্যাটরিনা (লুডমিলার মা)।

১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ – এই পাঁচ বছর পুতিন রাশিয়ান এজেন্ট হিসেবে পূর্ব জার্মানিতে কাজ করেন। জার্মানিতে কাজ করাকালীন তিনি পদন্নোতি পেয়ে প্রথমে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল এবং পরে আবারও পদন্নোতি পেয়ে বিভাগীয় প্রধানের প্রধান সহকারী হন। ১৯৮৯ সালে জার্মান রিপাবলিকে কাজ করা রাশিয়ান এজেন্টদের জন্য প্রদেয় মেডেল ও সম্মাননায় ভূষিত হন “ন্যাশনাল পিপলস্ আর্মি”’ এর প্রতি তাঁর নিঃসার্থ সেবার পুরস্কার হিসেবে।

১৯৯০ সালে পুতিন জার্মানিতে তাঁর কাজ শেষ করে লেলিনগ্রাদে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি লেলিনগ্রাদ স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের সহকারী হিসেবে কাজে যোগ দেন। এই পদে তাঁর দায়িত্ব ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পরিচালককে সহায়তা করা।

১৯৯১ সালের জুনে সেইন্ট পিটার্সবার্গ সিটি হল এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন; এবং ১৯৯৪ সাল থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ সিটি গভর্মেন্টের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান।

জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের সহকারী প্রধান হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে ১৯৯৬ সালে পুতিন তাঁর পরিবারের সাথে মস্কোতে চলে যান। 

১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে একই সাথে রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক অফিসের সহকারী চিফ অব স্টাফ এবং প্রধান নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৮ সালের মে মাসে তিনি রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক দপ্তরের প্রধান চিফ অব স্টাফ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং সেই বছরের জুলাইয়েই তিনি ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সালের মার্চ থেকে তিনি রাশিয়ান ফেডারেশানের নিরাপত্তা বিষয়ক কাউন্সিলের সচিব হিসেবে যোগদেন।

putin

সেই বছরেরই আগস্ট মাসে তিনি রাশিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। রাশিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বরিস পুতিনকে এই পদে যোগদান করার জন্য প্রস্তাব দেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে  ভাবনাকে তিনি বর্ণনা করেছেন – “আমার সেই সময়ের চিন্তা ছিল, আমি যদি এর মধ্য দিয়ে এক বছর ভালভাবে টিঁকে যেতে পারি সেটাই হবে একটা ভাল শুরু। আমি যদি রাশিয়াকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিছু করতে পারি তা অবশ্যই গর্বিত হওয়ার মত কিছু হবে।”

১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পুতিন রাশিয়ার আপৎকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেয়ার অল্প পরেই পুতিন ২০০০ সালের ২৬শে মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। সেই বছরের ৭ই মে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর শপথ গ্রহণের পর  প্রথম ভাষণে তিনি বলেন – “আমাদের সবার লক্ষ্য এক। আমরা সবাই চাই রাশিয়া একটি মুক্ত, উন্নত, প্রাচূর্যময়, শক্তিশালী এবং সভ্য দেশ হোক। এমন একটি দেশ যা নিয়ে এর নাগরিকরা গর্ব করবে এবং যে দেশ সারা বিশ্বের সম্মান অর্জন করবে। হয়তোবা সবসময়ে ভুলকে পাশ কাটানো সম্ভব হবে না। কিন্তু আমি যা প্রতিজ্ঞা করতে পারি, এবং আমি প্রতিজ্ঞা করছিও যে আমি সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাব।”

প্রথম মেয়াদে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দারুন সফলতা ও সাধারন রাশিয়ানদের মাঝে দারুন জনপ্রিয়তা অর্জন করার পর ২০০৪ সালের ৪ মার্চ পুতিন আবারও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালের ৮ মে পুতিন দ্বিতীয়বারের মত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান।

২০১১ সালের নভেম্বরে পুতিন আবারও রাশিয়ার টুয়েলভথ্ পার্টি কনগ্রেস থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মনোনয়ন পান। ২০১২ সালের মার্চে তিনি আবারও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ এবং এর ইতিহাস রক্তাক্ত ও করুণাপূর্ণ।তাঁর দৃঢ়চেতা ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে তিনি রাশিয়ার রাজনীতিবিদ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অসততাকে দমনে রেখেছেন। তার হাত ধরেই আজকে রাশিয়া সুপার পাওয়ার এ পরিনিত হয়েছে। 

পোস্টটি ভালো লাগলে factarticle এর সাথেই থাকবেন। 

BY:Factarticle.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *